হাই, আমি হাসান। লাজুক স্বভাবের একটি ছেলে। ইউনিভার্সিটি তে এক মেয়ের সাথে প্রেমে পড়ি। সেই প্রেমের শেষ পরিণতি এত ভয়ংকর হবে, তা ধারনার বাইরে ছিল। এই ইউনিভার্সিটি প্রেমের গল্পটি শেষ পর্যন্ত পড়ার অনুরোধ রইল। আজ মনের দুঃখে, ব্যাথিত হৃদয় নিয়ে লিখতে বসেছি। যদি আমি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাই, তাহলে আমার লেখা এই ডাইরিটা যেন কেউ পায়, আর সবাইকে আমার অপরাধের কথা জানিয়ে দেয় এটাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি।


 কেন জানিনা, যখন থেকে আমার বোঝার ক্ষমতা হয়েছে, তখন থেকেই মেয়েদের প্রতি আমার এলার্জি। রাস্তায় অজানা মেয়ে দেখলেই আমার মন চায় অন্য দিক দিয়ে পালিয়ে যাই, দুইবার রাস্তায় মেয়ে আসছে দেখে আমি আগেই সাইট কাটিয়ে পালাতে গিয়েছিলাম। 

একবার কুকুরের তাড়া খেঁতে খেতে বেঁচেছিলাম, আরেকবার ড্রেনে পড়তে পড়তে বেঁচেছিলাম। তাই মেয়ে দেখলে আর না পালিয়ে মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে যেতাম। আমার বন্ধুরা আমাকে মেয়ে বলেও ক্ষেপাত, কিন্তু তাতে আমার কি, যে যা বলে বলুক গা নিজের পথে চলতেই যাও।

সে যাই হোক এতক্ষণে হয়ত বুঝে গিয়েছ, আমি কেমন ধরনের ছেলে। কিন্তু এমন ছেলের জীবনেও প্রেম নামক এক অনুভূতির যে আগমন হবে সেটা জানা ছিল না। কোনো দিন অচেনা মেয়ের মুখের দিকে চোখ তুলে না তাকানো ছেলেটাও যে প্রেমে পড়বে, তা অনেকটা অনাকাঙ্ক্ষিত।

এবার আসল ঘটনায় আসি। কলেজ পাশ করে সদ্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। আমি একজন ভূগোলের ছাত্র, সবসময় বই-পত্র নিয়েই থাকতে বেশি পছন্দ করি। আমাদের কলেজের ভুগোল ডিপার্টমেন্টের মধ্যে সেবার শুধু আমার নামই মেরিট লিস্টে উঠেছিল।

লজ্জা ভাব নিয়ে ইউনিভার্সিটি লাইফের প্রথম ক্লাস করতে গিয়েছিলাম। আমাদের ভূগোল বিভাগে ছেলে মাত্র ১১ জন বাকিরা সবাই মেয়ে। সর্বনাশ হয়েছে, এখানে আমি টিকে থাকব কিভাবে! সেদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পড়, ক্লাস রুম থেকে বাইরে বেড়িয়েছি। হাঁতে আমার এখানকার একমাত্র বন্ধু খাতা আর কলম। গেটের উঁচু জায়গাটিতে পা লেগে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই, চোখের ভারী চশমার লেন্সটাও কোথায় যে ছিটকে পড়ল, কিছুই বোঝা গেল না, সব কিছুই যেন ঝাপসা দেখছি, আর কানে শুধু ভেসে আসছে আমার সহপাঠীদের হাসির আওয়াজ।

ইসস প্রথম দিনেই কি এরকম হওয়াটা জরুরী ছিল। এরপর একজনকে আমার দিকে আসতে দেখলাম, আমি ঝাপসা দেখছি, তাই প্রথমে তার মুখটা দেখতে চাইলেও বুঝতে পারলাম না। যখন সে আমাকে আমার ছিটকে পড়ে যাওয়া চশমা হাঁতে দিয়ে বলল- “তোমার চশমা” তখনই বুঝেছিলাম, আরে এ তো মেয়ের গলা, হায় ভগবান এইসব কি হচ্ছে?

সে যাই হোক আমার মত সংরক্ষণশীল, মেয়ের প্রতি এলারজি থাকা ছেলেটারও সেই মেয়েটির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বলাবাহুল্য সেই মেয়েটিই ইউনিভার্সিটি লাইফের আমার প্রথম বন্ধু। এরপর সময়ের সাথে সাথে আমাদের বন্ধুত্ব আরও মজবুত হয়ে যায়।

কি জানি কখন যে এই বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রেমের সম্পর্কে পরিণত হয়েছে তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পাড়ি নি। তবে, আমি তাকে বলার আগেই সে আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। এরপর জীবনে শুরু হয় নতুন আরেক মোড়।

সবসময় বই নিয়ে ব্যস্ত থাকা ছেলেটাও ধীরে ধীরে সেই মেয়েটির অনুরক্ত হয়ে উঠে। দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে যায়, ইউনিভার্সিটি ফাইনাল পরীক্ষা এসে হাজির হয়। এরই মধ্যে আমরা একে অপরের বাগদত্তা হই।

এরপর কেন জানিনা হঠাৎ, আমার মন বলে উঠে, এই সব প্রেম-ভালোবাসা সবই মোহ। মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ক্যারিয়ার। আজ যে আমাকে সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যদি ভালো কাজ না পাই সে কি রাখবে তার কথা? মোটেই না। তাই এরপর ধীরে ধীরে এগুলি থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করি। কিন্তু যতই তার থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করি, ততই যেন তার সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলি চোখের সামনে এসে পড়ে। তাকে ভুলতে গেলেও ভুলতে পারিনা।

এরপর তাকে ছেড়ে যাওয়ার একটি সুযোগ আমার কাছে চলে আসে, আমি রিমোট সেন্সিং নিয়ে পড়ার জন্য মুম্বাই যাওয়ার পরিকল্পনা করি। আর সে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। অবশেষে তাকে বিদায় জানিয়ে চলে যাই মুম্বাই। সেখানকার ব্যস্ত জীবনে, ধীরে ধীরে আমাদের প্রেমের সম্পর্ক ফিকে হতে থাকে। একসময় ফোন করাটাও ম্যাসেজ করায় পরিণত হয়।

মুম্বাইয়ে কিভাবে তিনটা বছর কাটিয়ে দিলাম বুঝতেও পারলাম না। এই তিনবছরের মধ্যে তাকে মাত্র হাঁতে গোণা কয়েকবার ফোন করেছি। এমনি কথা হত ঠিকই তবে সামান্য তাও আবার ম্যাসেজের মাধ্যমে। আমার কাছে আমার ক্যারিয়ারই মূল লক্ষ্য। আমি মনে করি, ভালো ক্যারিয়ার মানেই ভালো উপার্জন।

ওইসব প্রেম ভালোবাসা, সবই সাময়িক সময়ের উত্তেজনা মাত্র। যখন বয়স বাড়বে তখন প্রেম কি পাড়বে দুবেলা মুখে খাবার জোটাতে। মুম্বাইয়ে আমার কোর্স শেষ হতে না হতেই ইজরায়েলে একটি ভালো চাকরি পেয়ে যাই। যাক এত দিনে আমার স্বপ্ন পূর্ণ হল।

 

কলমেঃ হাসান